মহামারী চলাকালীন সুস্থ্য থাকার অর্থ এই নয় যে, কেবলমাত্র কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ এড়ানো উচিত। পাশাপাশি প্রাত্যহিক দাঁত ও মুখের যত্ন নেয়াও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সাম্পতিক কোভিড-১৯ মহামারী যা স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে এবং এটির প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দুবির্ষহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দাঁতের চিকিৎসা বর্তমানে অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যাতে কোভিড-১৯ সংক্রমণ কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হয়। এই দাঁতের চিকিৎসা, ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জামদি (পিপিই) দ্বারা এবং প্রয়োজনে নেতিবাচক চাপ দ্বারা সমর্থিত কক্ষে কঠোরভাবে পরিচালনা সম্ভব।
ভাইরাস সংক্রমন, প্রতিরোধ এবং মহামারী নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। যেহেতু, দাঁতের চিকিৎসায় চিকিৎসককে রোগীর মুখের খুর কাছাকাছি যেতে হয়, তাই এক্ষেত্রে দরকার সর্বোচ্চ সর্তকতা। ডাক্তার ও রোগীর মাঝে নূন্যতম ৩ ফিট বা তারও বেশী দূরত্ব রাখা উচিত। দাঁতের চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সারফেস ডিস্ইনফেকটেন্ট ব্যবহার করা উচিত। দাঁত ও মাড়ির জরুরী চিকিৎসার জন্য নিবিড় চিকিৎসা পদ্ধতি মূল্যায়ন করা হয়, যা রোগী ও দাঁতের চিকিৎসকগনের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বর্তমান মহামারীতে খুব জরুরী দাঁত ও মাড়ির চিকিৎসার জন্য দাঁতের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। প্রাত্যহিক সকল দাঁতের চিকিৎসার মধ্যে নান্দনিক বা সৌন্দর্যবর্ধক দাঁতের চিকিৎসার জন্য টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করুন। নতুবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরুন। চিকিৎসকের দাঁতের চিকিৎসার পাশাপাশি করোনার কোনও উপসর্গ থাকলে সেটি বলুন, উপসর্গ লুকিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি না বাড়ানোই বাঞ্ছনীয়, এতে রোগী ও চিকিৎসকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগীদের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা, বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার, হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার, মাউথওয়াস ব্যবহার ও রোগীর গুরুত্ব অনুযায়ী হাসপাতাল বা চেম্বার একা আসাই শ্রেয়। হাসপাতাল বা চেম্বার প্রবেশের ক্ষেত্রে নির্দেশনা মেনে চলাই বাঞ্ছনীয়।
এই মহামারীর সময়ে, পারিবারিক ভাবে নিজেকে সুস্থ্য রাখা ও দাঁতের যত্নে ঘরোয়া ভাবে আমরা কিছু বিষয় অনুসরণ করতে পারি।
প্রাত্যহিক হাত ধৌত করুন: ব্যক্তিগত কাজের আগে ও পরে কমপক্ষে সাবান পানি নিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধৌত করা।
নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করুন : দিনে কমপক্ষে সকালে খাবার পর ও রাতে ঘুমাতে যাবার আগে নিশ্চিত করুন, যে আপনি ২ বার ফ্লোরাইডেটেড টুথপেষ্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করেন। মেকানিক্যাল টুথব্রাশ সাধারণ টুথব্রাশের চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর ও আরামদায়ক। নিয়মিত ব্রাশ করলে এটি মুখে ডেন্টাল প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া জমতে বাঁধা দেয়। মনে রাখতে হবে যে, আপনার টুথব্রাশটি প্রতি তিন মাস পরপর পরিবর্তন করা বাঞ্ছনীয়। আপনি যদি সংক্রমণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হন তবে টুথব্রাশটি জীবাণু মুক্ত করার বিষয়ে সচেষ্ট থাকুন।
আমাদের জিহ্বাতে অনেক ব্যাকটেরিয়া লুকিয়ে থাকে, যা হ্যালিটোসিস বা মুখের দুর্গন্ধের জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী। সেজন্য দাঁত ব্রাশের পাশাপাশি জিহ্বাকে স্ক্র্যাপিং করা প্রয়োজন। এজন্য আপনি একটি ডেন্টাল স্ক্র্যাপার কিনে নিতে পারেন যা ফার্মেসীতে অনেকটাই সহজলভ্য।
দুই দাঁতের মাঝের ফাঁকা অংশ পরিস্কার রাখাঃ দাঁত ব্রাশের সময় দুই দাঁতের মাঝের ফাঁকা অংশে যেখানে ব্রাশ সহজে পৌছায় না, এমনস্থানে ফ্লসিং এর সাহায্যে সহজেই দুই দাঁতের মাঝের ফাঁকা স্থান পরিস্কার রাখা যায়। এটি ব্যবহারে দুই দাঁতের ফাঁকা অংশে খাবার জমা হতে দেয় না ও মুখকে অনেকটাই দুর্গন্ধমুক্ত রাখে। বাজারে এমন অনেক ধরনের ডেন্টাল ফ্লস বা সুতা পাওয়া যায়। পাশাপাশি, আঙ্গুল দিয়ে মাড়ি মালিশ করলে এতে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং মাড়ি সুস্থ থাকে।
মাউথ্ওয়াশ ব্যবহার করুনঃ প্রতিনিয়ত মাউথ্ওয়াশ ব্যবহার আপনাকে অনেকটাই দুর্গন্ধমুক্ত সজীব নিঃশ্বাস দিবে। এটি মুখের অপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। যদি আপনি মুখে শুষ্কতা অনুভব করেন তবে অ্যালকোহল মুক্ত মাউথ্ওয়াশ ব্যবহার করাই শ্রেয়। তবে, মাউথ্ওয়াশ কতদিন নিয়মিত ব্যবহার করবেন তার জন্য একজন দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। মাউথ্ওয়াশের পাশাপাশি হালকা গরম পানি নিয়ে মুখ কুলকুচি করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়। সাধারণত মাউথওয়াশ প্রতিবারে ৩০ সেকেন্ডের অধিক সময় মুখে দিয়ে কুলকুচি করা ঠিক নয়, এতে মুখে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়া (নরমাল ফ্লোরা) ধ্বংস হয়ে যায়, যা অজৈব নাইট্রেটকে নাইট্রিক অক্সাইডে পরিণত হতে বাধা প্রদান করে, যেটি উচ্চ রক্তচাপের ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন চিকিৎসা লক্ষ্য নিশ্চিত করে এবং নিদিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি স্থিতিশীল রক্তচাপের স্তর নির্ধারণ করতে পারে। আমাদের সকলের উচিত খাবারের ৩০ মিনিট পরে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা ও পরিশেষে, পানি দিয়ে মুখ কুলকুচি করা।
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুনঃ কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার যতটা সম্ভব কম গ্রহণ করুন। বারবার খাদ্য গ্রহণ দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায় যদি ভালভাবে প্রতিবার খাবার গ্রহণের পর দাঁত ব্রাশ না করা হয়। তরতাজা শাকসব্জি, মৌসুমী ফল, দুধ, ডিম, টকদই, গ্রিন টি, ছোট ও সামুদ্রিক মাছ খান।
চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুনঃ দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্যের জন্য অধিক চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুন। অধিক চিনিযুক্ত খাবার দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সংবেদনশীল পানীয়ের একটি ক্যান বা বোতলে ১০ বা তার বেশী চা চামচ চিনি থাকতে পারে। আপনি যদি অধিক সময় মিষ্টিযুক্ত কফি, চা বা পানীয় গ্রহণ করেন তবে এটি আপনার মুখ গহ্বরের বিশেষত দাঁত গুলির ক্ষতি করবে।
পর্যাপ্ত পানি সেবন করুন: পর্যাপ্ত পানি সেবন করুন এটি আপনার শরীরের পানি শূন্যতা প্রতিরোধ করে, বৃক্ক ভালো রাখে ও দেহের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করে। খাদ্য গ্রহণের কমপক্ষে ৩০ মিনিট পূর্বে পানি খান এটি খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে ও খাদ্য গ্রহণের পরপরই পানি সেবন থেকে বিরত থাকুন, এসময় খাদ্য পরিপাকের এনজাইমগুলো ভালোভাবে কাজ করে ।
ধূমপানে বিরত থাকুন: ধূমপান আপনার মুখ গহ্বরের রক্ত প্রবাহকে সীমিত করে চলাচলে বাধা দেয়। এটি মুখ ও মাড়ির ক্যান্সার সৃষ্টি করে। একইসাথে পান ও জর্দ্দা পরিহার করুন। এটিও মুখ ও মাড়ির জন্য ক্ষতিকারক।
করোনা মহামারীর এই সময়ে গুরুত্ব অনুযায়ী দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুধাবন করতে পারি।
দাঁতের সমস্যা যা অধিক গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন:
১। মুখ দিয়ে অনবরত প্রচুর রক্তপাত।
২। মুখ গহŸরের অভ্যন্তরে সংক্রমণ যা শ্বাসনালীর প্রদাহ বা বাধা দিয়ে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে।
দাঁতের সমস্যা যা গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন:
১। অন্যান্য অস্ত্রোপচার এর আগে দাঁত ও মাড়ির চিকিৎসা অত্যাবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ- হৃদরোগের শল্যচিকিৎসা, ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপী ও কেমোথেরাপী চিকিৎসা।
২। দাঁতের সংবেদনশীলতা, গুরুতর দাঁত ব্যথা ও মাড়ির পুঁজযুক্ত ফোঁড়া।
৩। মাড়ির আক্কেল দাঁতের ব্যথা ও দাঁত তোলার পরবর্তী ব্যথা ( ড্রাই সকেট)
৪। আঘাতজনিত কারণে গুরুতর দাঁত ব্যথা ও ভাঙ্গা দাঁত।
৫। দুর্ঘটনাজনিত আঘাতপ্রাপ্ত দাঁত বিচ্ছিন্ন হওয়া।
৬। ভেঙ্গে যাওয়া ডেনচার বা দাঁতের পাটি দ্বারা মুখ ও মাড়ি ক্ষত হওয়া।
৭। ভেঙ্গে যাওয়া ক্রাউন বা দাঁতের মুকুট দ্বারা মুখ ও মাড়ি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া।
৮। জরুরী অর্থোডন্টিক চিকিৎসা যা মুখ ও মাড়িকে রক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ- আলগা বা ভাঙ্গা অপসারণযোগ্য সরঞ্জাম বা স্থির সরঞ্জাম আলগা হয়ে যাওয়া যথাঃ অর্থোডন্টিক তার, ব্যান্ড, ব্রাকেট এবং লাইগেচার।
দাঁতের সমস্যা যা কম গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন:
১। দাঁতের চেকআপ এবং নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসা যেমন- ডেন্টাল স্কেলিং ও পলিশিং করা।
২। দাঁত ব্যথা বা দাঁতের সংবেদনশীলতার মত লক্ষণ ছাড়াই দাঁতের ক্ষয়।
৩। আঁকাবাকা দাঁত ও নান্দনিক বা সৌন্দর্যবর্ধক দাঁতের চিকিৎসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *